শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০১৯

বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা : পর্ব পাঁচ


    বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা : পর্ব পাঁচ

   ফেসবুক থেকে       শেয়ার করেছেন         প্রণব কুমার কুণ্ডু


প্রণব কুমার কুণ্ডু









বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা : পর্ব পাঁচ

বাংলাসাহিত্যে পদার্থবিজ্ঞানের বিষয়বিশেষ নিয়ে গ্রন্থ রচনায় সর্বাধিক কৃতিত্বের অধিকারী সম্ভবত জগদানন্দ রায়। ১৯২৪ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত তিনি শব্দ, তাপ, আলোক, চুম্বক, স্থির ও চলবিদ্যুত নিয়ে আলাদা আলাদা গ্রন্থ রচনা করেন।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে বঙ্গসাহিত্যে আবির্ভুত হলেন দুইজন বিজ্ঞানী - জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়। জগদীশচন্দ্রের রচনায় বৈজ্ঞানিকের যে নিজস্ব অনুভুতি ও মৌলিকতার পরিচয় পাওয়া যায় তা অনন্য। ১৯২১ সালে রচিত জগদীশচন্দ্রের 'অব্যক্ত' বাংলা বিজ্ঞানসাহিত্যের একটি চিরস্থায়ী সম্পদ। এই গ্রন্থটি হল তাঁর কিছু প্রবন্ধ ও বক্তৃতার সংকলন। মুল আলোচ্য বিষয় অদৃশ্য আলোক, নির্বাক উদ্ভিদজীবন এবং উদ্ভিদস্নায়ুতে উত্তেজনাপ্রবাহ।
পক্ষান্তরে প্রফুল্লচন্দ্র মুলত প্রাচীন ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যে তুলনামুলক আলোচনা করেছেন। তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থটি হল 'হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি' যার দুটি খন্ড ১৯০২ ও ১৯০৬ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৪৩ সালে গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় অনুবাদিত হয়। 'হিন্দু রসায়নী বিদ্যা'র ভুমিকায় প্রফুল্লচন্দ্র লেখেন, "যেদিন হইতে সমাজের বুদ্ধিমান ও বিদ্বান লোকেরা শিল্পবিজ্ঞানের চর্চ্চা ত্যাগ করিয়া তাহার ভার অশিক্ষিত নিম্নশ্রেণীর লোকের উপর অর্পণ করিলেন সেইদিন হইতে আমাদের অধঃপতন আরম্ভ হইল। নাপিতের হস্তে অস্ত্রচিকিৎসা ও বেদের হস্তে উদ্ভিদবিজ্ঞানের আলোচনার ভার ন্যস্ত করিয়া আমরা নিশ্চিন্তে বসে পরলোকচিন্তায় ব্যস্ত হইলাম।" মন্তব্যটি বিতর্কিত হতে পারে তবে গুরুত্বহীন নয়।
প্রফুল্লচন্দ্রের গ্রন্থটির একটি দুর্বলতা হল, অতিরিক্ত স্বদেশপ্রীতি ও স্বজাত্যবোধের উপর নির্ভরতার ফলে বৈজ্ঞানিকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে আঘাত পেয়েছে।
পরবর্তী বিজ্ঞান লেখক হিসাবে যাঁর কথা মনে আসে তিনি আর কেউ নন, আমাদের রবীন্দ্রনাথ। 'বালক' ও 'সাধনা' পত্রিকা দুটিতে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানালোচনায় প্রথম উদ্যোগী হন। সারাজীবনে তিনি ছোটবড় একাধিক বিজ্ঞানপ্রবন্ধ লিখেছেন। তবে বঙ্গসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য অবদান 'বিশ্বপরিচয়', যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৭ সালে। এতে তিনি পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগত, গ্রহলোক ও ভূলোক - এই পাঁচটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটির ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লেখেন, "শিক্ষা যারা আরম্ভ করেছে, গোড়া থেকেই বিজ্ঞানের ভাণ্ডারে না হোক, বিজ্ঞানের আঙিনায় তাদের প্রবেশ করা অত্যাবশ্যক।" বিজ্ঞান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারার প্রকৃত প্রকাশ এই মন্তব্যটিতে।
পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য্য বিশ শতকের গোড়ার একজন জনপ্রিয় বিজ্ঞানলেখক। ১৯১৮ সালে প্রকাশিত 'নব্যবিজ্ঞান' তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। 'পদার্থবিদ্যার নবযুগ' এবং 'বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের কাহিনী' তাঁর আরও দুটি উল্লেখযোগ্য বই।
আর একজন প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানলেখকের কথা বলে এই পর্ব শেষ করবো। তিনি হলেন রাজশেখর বসু, যাঁকে আমরা পরশুরাম ছদ্মনামেই বেশি চিনি। ১৯০৩ সালে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যালে রসায়নবিদ হিসাবে চাকুরিজীবন শুরু করে স্বীয় দক্ষতায় অল্পদিনেই তিনি ঐ কোম্পানীর পরিচালক পদে উন্নীত হন। কেমিস্ট্রি ও ফিজিওলজির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে তিনি এক নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। রাজশেখর বসুর তত্ত্বাবধানে বেঙ্গল কেমিক্যাল সমৃদ্ধশালী গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্রে পরিণত হয়। 'ভারতের খনিজ' তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তবে পরশুরাম ছদ্মনামে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে আঘাত করে তাঁর ব্যঙ্গকৌতুক ও বিদ্রুপাত্মক গল্পগুলির জন্যেই তিনি সুপ্রসিদ্ধ।
(চলবে)
(তথ্যসূত্র : বঙ্গসাহিত্যে বিজ্ঞান - ডঃ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য, অন্য কোনো সাধনার ফল - আশীষ লাহিড়ী, বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ - বিনয় ঘোষ)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন