শিল্পী যামিনী রায়দের বাড়ির দুর্গাপূজা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শিল্পী যামিনী রায়দের বাড়ির দুর্গাপূজা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

বড়ু চণ্ডীদাসের পুঁথি, শিল্পী যামিনী রায়দের বাড়ির দুর্গাপূজা













প্রণব কুমার কুণ্ডু











  বড়ু চণ্ডীদাসের পুঁথি, শিল্পী যামিনী রায়দের বাড়ির দুর্গাপূজা


  ফেসবুক থেকে      শেয়ার করেছেন        প্রণব কুমার কুণ্ডু


রথঘরে দেবীমুণ্ডের পুজো
************************

বাঁকুড়ার এক গ্রামে গোয়ালঘর থেকে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ পুঁথি আবিষ্কার করেছিলেন বসন্তরঞ্জন রায়। শিল্পী যামিনী রায় তাঁরই খুড়তুতো ভাই। সেই পরিবারের দুর্গাপুজোর বিচিত্র প্রথা।
বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের কৃষ্ণপ্রেম ও টেরাকোটার মন্দিরের শিল্পকলার খ্যাতি তত দিনে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব জুড়ে। দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা ছুটে আসছেন মল্লরাজধানী বিষ্ণুপুরে। বিষ্ণুপুরের কাছে রাধানগর সংলগ্ন কাঁকিল্যা গ্রামের এক গোয়ালঘরের মাচায় তখনও পড়ে ছিল এক পুঁথি, বিচিত্র কৃষ্ণকথা— প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে যা রচনা করে গিয়েছিলেন কবি বড়ু চণ্ডীদাস।
সেই পুঁথি জনসমক্ষে এল ১৯০৯ সালে। আর তা সম্ভব হয়েছিল বেলিয়াতোড়ের বাসিন্দা বসন্তরঞ্জন রায়ের হাত ধরে। গোয়ালঘরের মাচা থেকে তাঁরই মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঢুকে পড়ল সেই পুঁথি। বসন্তরঞ্জনই বড়ু চণ্ডীদাসের সেই পুঁথির নামকরণ করলেন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’।
বসন্তরঞ্জন রায়ের আরও একটি পরিচয়, সম্পর্কে তিনি বরেণ্য চিত্রকর যামিনী রায়ের দাদা। বেলিয়াতোড়ে এই রায় পরিবার ‘জমিদার পরিবার’ নামে খ্যাত। প্রাচীন এই পরিবারের দুর্গাপূজাটিও ঐতিহ্যমণ্ডিত। মল্লরাজাদের আমল থেকে প্রচলিত এই পুজোকে অনেকে ‘মুণ্ড পুজো’ও বলেন। কারণ এখানে কেবল দেবীর মুখমণ্ডলের মূর্তিরই পুজো করা হয়।
সেই গল্পই শোনাচ্ছিলেন এই পরিবারের উত্তরসূরি তাপস রায়। জানালেন, মল্লরাজাদের আমলে বর্গি আক্রমণের জেরে প্রাণভয়ে বাংলাদেশ থেকে বিষ্ণুপুরে এসে পড়েছিলেন বাংলার বারো ভুঁইয়ার এক ভুঁইয়া, রাজা প্রতাপাদিত্য রায়ের এক ভাই। তিনি ‘কচু রায়’ নামে পরিচিত হন। মল্লরাজারা কচু রায়কে আশ্রয় দিয়েছিলেন, বেলিয়াতোড়ে তাঁকে জায়গিরও দেন। সেই থেকেই রায় পরিবারের বাস শুরু বেলিয়াতোড়ে। কচু রায়ের তিন ছেলে— বড় রায়, মেজ রায় ও ছোট রায়। বসন্তরঞ্জন, যামিনী রায়েরা মেজ রায়ের বংশধর ছিলেন। তাপসবাবু ছোট রায়ের উত্তরসূরি।
তাপসবাবুর থেকেই জানা গেল, বেলিয়াতোড়ের রায় পরিবারের মুণ্ড পুজো তিনশো বছর বা তারও বেশি পুরনো। এই পুজো শুরুর আগে থেকেই অবশ্য রায় পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গিয়েছিল বিষ্ণুপুরে। তখন এই পরিবারের বাস ছিল সেখানেই। দেবীর সেই প্রাচীন দশভুজা মূর্তি বিষ্ণুপুর শহরের গোপালগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত। এখনও নিত্যপুজো হয়, তার যাবতীয় খরচ বেলিয়াতোড় থেকেই সামলান রায় পরিবারের বর্তমান সদস্যেরা।
শোনা যায়, কচু রায়ের এক বংশধর পুরীতে তীর্থ করতে গিয়েছিলেন। সেখানেই এক সাধু তাঁর হাতে ওই প্রাচীন দশভুজা দেবীমূর্তি তুলে দিয়েছিলেন। সেই বিগ্রহেরই প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু হয় গোপালগঞ্জে। পরবর্তী কালে রায় পরিবার বেলিয়াতোড়ে এসে বসবাস শুরু করে। তখনও মুণ্ড পুজোর প্রচলন হয়নি। জনশ্রুতি, পরিবারের কাউকে দেবী স্বপ্নাদেশে নির্দেশ দেন, দশভুজারূপে যেহেতু তিনি বিষ্ণুপুরে পূজিতা হচ্ছেন, তাই পুজোর চার দিন বেলিয়াতোড়ে কেবল দেবীর মুখমণ্ডল গড়ে পুজো করতে হবে। সেই থেকেই বিষ্ণুপুরে দেবীর নিত্যপূজার পাশাপাশি বেলিয়াতোড়েও রায় পরিবারের বাৎসরিক দুর্গাপুজো শুরু হয়।
বেলিয়াতোড়ে পুজো সামলানোর পাশাপাশি রায় পরিবারের সদস্যেরা বিষ্ণুপুরেও দেবীর পুজোয় যোগ দিতেন। এক বার বিষ্ণুপুরের পুজোয় যোগ দিতে যাওয়ার পথে কী এক অঘটন ঘটে। তার পর থেকেই পরিবারের সদস্যেরা দুর্গাপুজোর চার দিন বিষ্ণুপুরের প্রাচীন পুজোয় যাওয়া বন্ধ করে দেন। এটিই ক্রমে পারিবারিক প্রথা হয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় ‘বাহক’ প্রথা। পরিবারের লোক অনুপস্থিত থাকলেও বিষ্ণুপুরের পুজোর নৈবেদ্য বা যাবতীয় উপকরণ বেলিয়াতোড় থেকে পাঠানো হত। বেলিয়াতোড় সংলগ্ন বনগ্রাম এলাকার কিছু গ্রামবাসী জমিদারের ‘বাহক’ হিসেবে সেই সব নিয়ে বিষ্ণুপুরে যেতেন। ষষ্ঠী থেকে একাদশী পর্যন্ত বাহকেরা বিষ্ণুপুরে দেবীর মন্দিরেই থাকতেন। পরে ফিরে আসতেন বেলিয়াতোড়ে। শতাব্দীপ্রাচীন সেই প্রথা আজও বর্তমান। বনগ্রামের কিছু বাসিন্দা এখনও রায়বাড়ির বাহক হিসেবে পুজোর উপকরণ নিয়ে ষষ্ঠীতে বিষ্ণুপুরের দশভুজা মন্দিরে যান।
বেলিয়াতোড়ে রায়বাড়ির নিজস্ব দুর্গামন্দিরে প্রাচীন সেগুন কাঠের রথঘর রয়েছে। পুজোর সময়ে দেবীর মুখমণ্ডলের মূর্তি সেই রথঘরে রাখা হয়। রথঘরের গায়ে রং-তুলি দিয়ে চারপাশে বাহন সমেত লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও শিবের ছবি আঁকা হয়।
বিষ্ণুপুরে রায়বাড়ির আদি পুজোয় ঢাক বাজানো হলেও বেলিয়াতোড়ের পুজোয় ঢাকের বদলে কাড়া-নাকাড়া বাজানো হয়। নবপত্রিকা স্নানের সময়ে ও বিসর্জনের সময়ে কাড়া-নাকড়ার ছন্দ শোনা যায়। রায়বাড়ির বারোটি পরিবার এখন পুজো চালান।
বসন্তরঞ্জন বহু বছর আগেই বেলিয়াতোড় ছেড়েছিলেন। আর ফেরেননি। তাঁর কোনও এক নাতি পরিবার নিয়ে সত্তরের দশকে কয়েক বছর বেলিয়াতোড়ে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন। বেলিয়াতোড়ে থাকাকালীন তিনি পরিবারের এই পুজোয় যোগও দিতেন। যদিও পরে তিনি বসন্তরঞ্জনের বসতভিটে বিক্রি করে সপরিবার চলে যান।
বসন্তরঞ্জনের পরিবারের আর কোনও খোঁজ পাননি বেলিয়াতোড়ে রায় পরিবারের বর্তমান সদস্যেরা। মুণ্ড পুজো অবশ্য চলছে নির্বিঘ্নেই।
source-- ananda bazar patrika
৬ অক্টোবর, ২০১৮