লাক্ষা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
লাক্ষা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০২২

লাক্ষা

 

লাক্ষা

শেয়ার করেছেন : প্রণব কুমার কুণ্ডু






















আমি পুরুলিয়া জেলার ঝালদায় লাক্ষা তৈরির ফ্যাক্টরি দেখেছি।
শিরীষ গাছে লাক্ষা কীটের সংক্রমণ:-
শিরীষ গাছ একটি ছায়াতরু উদ্ভিদ ও বর্তমানে এর কাষ্ঠের বেশ গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। এটি একটি বহিরাগত উদ্ভিদ। সুদূর মেক্সিকো থেকে 200 বছর পূর্বে এর এই বঙ্গে আগমন। তা সত্ত্বেও এটি গ্রাম বাংলার একটি অতি পরিচিত স্বাভাবিক উদ্ভিদ। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম আলবিজিয়া লেবেক ও এটি ফ্যাবাসি গোত্রের উদ্ভিদ। বিদেশে একে লেবেক বৃক্ষ বলা হয়। এর শাখা প্রশাখা ঝড়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেকসময় সম্পূর্ণ বৃক্ষ উপড়ে পড়ে। এর পাকা ফল গরুর কাছে বেশ মুখরোচক।
এটি পর্ণমচি উদ্ভিদ হওয়ায় শীতে সমস্ত পাতা ঝরে যায় ও তা ঝাট দিয়ে বস্তাবন্দি করে গ্রামের মেয়েরা জ্বালানি রূপে। ফাল্গুন-চৈত্রে নতুন পাতা ও সুন্দর লাল-গোলাপি ফুল আসে। একটা সুন্দর গন্ধ বাতাসে ঘুরে বেড়ায়।
গাছটির খোপে শালুক পাখির বাসা হতে দেখা যায়। মৃত ডালের ও বাকলের পোকা খাওয়ার জন্য কাটঠোকরা আসে দারুণ একটা মিষ্টি আওয়াজ সৃষ্টি করে।
গ্রামের বুড়োরা শিরীষ গাছে উঠতে বারণ করে কারণ এর ডাল খুব সহজে ভেঙে পড়ে ও তা থেকে হাত,পা ভাঙার সম্ভাবনা থাকে। তাঁদের ভাষায়,"এর ডাল খুব মোড়কা রে ওই গাছে উঠিস নি!"

বহু পূর্বে এর কাষ্ঠ অনুষ্ঠান বাড়িতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হত। এখন এর কাষ্ঠ আসবাব তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বর্তমানে অতি পুরানো শিরীষ গাছ গুলি অবলুপ্তির পথে। এক রকমের মড়ক লেগেছে প্রায়। গ্রামের লোকেরা বলছে ক্যান্সার হয়েছে। অথচ এই ক্যান্সার সংক্রমিত ডাল কেনার জন্য কিছু লোক গ্রামে গ্রামে ঘুরছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে বলে এ থেকে ঔষধ তৈরি হয়, রং তৈরি হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। অন্বেষণ করে দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। এটি লাক্ষা কীটের সংক্রমণের কারণেই হচ্ছে।

লাক্ষাকীট চাষের জন্য কুল, শেয়াকুল, পলাশ, কুসুম (Schleichera oleosa), বাবলা (Acacia nilotica), খয়ের (A. catechu), অড়হড় (Cajanus cajan), বট (Ficus benghalensis), ডুমুর (F. carica), অশ্বত্থ (F. religiosa) ইত্যাদি গাছ ব্যবহৃত হয়।
ওই সমস্ত উদ্ভিদের সহিত লাক্ষা কীটের একটি মিথজীবী সম্পর্ক আছে। কীটগুলি কচি শাখা প্রশাখার নরম বাকলের সবুজ অংশ গুলি খেয়ে বংশবৃদ্ধি করে ও উপনিবেশ তৈরি করে, কিন্ত তাতে উদ্ভিদগুলি মরে না। শিরীষ গাছের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নেগেটিভ সম্পর্ক হয়েছে। লাক্ষা কীটের আক্রমণে গাছটি মরে যাচ্ছে। যদিও এতে কিছু অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা তৈরি হয়েছে, তবে শিরীষ গাছের বাঁচানোর জন্য আশু ব্যাবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। পূর্বে লাক্ষা ছিল এই বঙ্গের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান যা রপ্তানি হত ইউরোপে। কিন্তু ঊনিশ শতকের মধ্যভাগের পর এর চাহিদা লোপ পায়। বিদেশিদের কাছে লাক্ষা সাধারণভাবে ‘বেঙ্গল লাক্ষা’ নামে পরিচিত ছিল। শিল্প বিপ্লবের প্রারম্ভিক যুগে ইংল্যান্ডে লাক্ষাকে মূল্যবান দ্রব্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বস্ত্র রং করার জন্য ও অন্যান্য শিল্প দ্রব্যের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হতো এই লাক্ষা। সতেরো ও আঠারো শতকে ইউরোপীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলির রপ্তানি বাণিজ্যের বহরে এটি অন্যতম মূল্যবান দ্রব্য ছিল।
লাক্ষা পোকা পালনে উপযোগী বিভিন্ন ধরনের গাছে লাক্ষা উৎপাদন করা হতো। লাক্ষা চাষি বিশেষ গাছের নির্বাচিত ডালপালায় লাক্ষা পোকা পালন করত। এক সময় এই ডালগুলি পোকার মুখনিঃসৃত রসে সংক্রমিত হয়ে পোকার গুণগত ভিন্নতার কারণে কখনও লাল, গোলাপী অথবা রক্তবর্ণ ধারণ করত। উপযুক্ত সময়ে সংক্রমিত ডালগুলি কেটে প্রথমে ভেজানো হতো এবং পরে তা জলে সিদ্ধ করা হতো। যতক্ষণ পর্যন্ত ডালগুলি থেকে রং বেরুত ততক্ষণ পর্যন্ত সিদ্ধ করা অব্যাহত থাকত। লাক্ষার এই নির্যাসে প্রয়োগ করা হতো সামান্য পরিমাণ ফিটকিরি। এবার এই নির্যাসকে বাষ্পে পরিণত করা হতো। নিচে পড়ে থাকা রঙ্গের গুঁড়াকে একত্রিত করে বিভিন্ন খন্ডে খন্ডে সংরক্ষণ করতে হতো। লাক্ষা চাষের জন্য বস্ত্রবয়ন শিল্পিদের মতোই বিদেশিরা লাক্ষাচাষিদের নিয়োগ করত। ঊনিশ শতকের মধ্যভাগে সংশ্লেষী বা সিন্থেটিক রং আবিষ্কৃত হলে লাক্ষা তার বিশ্ব বাজার হারিয়ে ফেলে। তবে বিশ শতকের প্রথমাবধি এর স্থানীয় ব্যবহার অব্যাহত ছিল। বাংলা ছাড়াও লাক্ষা বার্মা ও দক্ষিণ ভারতে উৎপাদিত হতো। কিন্তু বিদেশি ক্রেতাদের নিকট বাংলার লাক্ষার চাহিদা ছিল সর্বাধিক। লাক্ষা দুই ভাবেই রপ্তানি হতো। কখনও সংক্রমিত ডাল চটের ব্যাগে পুরে আবার কখনও রঙের টুকরো হিসাবে।