মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২১

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের আয়া সোফিয়া

 তুরস্কের ইস্তাম্বুলের

আয়া সোফিয়া

শেয়ার করেছেন :- প্রণব কুমার কুণ্ডূ















 
  
আপডেট
২৩-০১-২০২১, ০১:৪২

স্বপ্নের চারণভূমি আয়া সোফিয়া, বিশালতায় মুগ্ধ পৃথিবী

স্বপ্নের চারণভূমি আয়া সোফিয়া, বিশালতায় মুগ্ধ পৃথিবী
‘আয়া সোফিয়া’ পৃথিবীর প্রাচীনতম নান্দনিক স্থাপত্য শিল্প। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে দেড় হাজার বছরের পুরনো এ ধর্মীয় স্থাপনাটি রোমান-বাইজেন্টাইন সম্রাটদের আমল থেকে প্রায় এক হাজার বছর খ্রিস্ট ধর্মের অন্যতম প্রধান চার্চ থাকলেও অটোমান সাম্রাজ্যে তা টানা পাঁচশত বছর ছিলে মুসলিমদের মসজিদ। ১৯৩৫ সাল থেকে ২০২০ সালের ২৩ জুলাই পর্যন্ত তা ছিল মিউজিয়াম। ২৪ জুলাই ২০২০ থেকে জুম্মার নামাজের মাধ্যমে তা আবার পরিবর্তন করা হয় মসজিদে।

আয়া সোফিয়া কালের এক বিস্ময়কর স্থাপনা, যা ধর্মীয় অনুভূতির মানুষের হৃদয়ে লালন করা স্বপ্নের চারণভূমি হিসেবে স্থান করে নেয় দেড় হাজার বছর ধরে। ৪র্থ শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতা পূর্ব-পশ্চিমে দুভাগ বিভক্ত হয়ে পড়ে। পশ্চিমে রোম ও পূর্বে ইস্তাম্বুল হয়ে উঠে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। বিভক্তি হওয়া রোমানদের পূর্ব অংশের নাম হয় বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য। এই সম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কনস্টান্টিনোপোল যা আজকের ইস্তাম্বুল। এশিয়া ও ইউরোপ সংযোগকারী ফসফরাস প্রণালীর পাশে বাইজেন্টাইন সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের নির্দেশে নির্মাণ করা হয় আয়া সোফিয়া।

অর্থডক্স খ্রিস্টানদের প্রধান চার্চ ছিলেন আয়া সোফিয়া। এর মধ্যে রোমান ক্যাথলিক চার্চ হিসেবেও গির্জাটি ব্যবহৃত হয় ১২০৪ সাল থেকে ১২৬১ সাল পর্যন্ত। ১৪৫৩ সালে তুরস্কের দ্বিতীয় সুলতান মেহমুদ বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপোল দখল করে নেন। সেই সঙ্গে প্রবেশ করেন আয়া সোফিয়া গির্জায়। তিনি শহরের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ইস্তাম্বুল। পরবর্তীতে উসমানী সম্রাজ্যের রাজধানী করা হয় ইস্তাম্বুলকে এবং মুসলিম বিশ্বের খেলাফতের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে ইস্তাম্বুল।

‘আয়া সোফিয়া’ সৃষ্টির পর ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও ক্ষমতার পালাবদলে প্রথমে ৯১৬ বছর খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মীয় চার্চ, পরে প্রায় ৫০০ বছর মুসলিমদের মসজিদ ও তারপরে ১৯৩৫ সাল থেকে টানা ৮৫ বছর মিউজিয়াম হিসেবে রূপ পরিবর্তন করা হয় ‘আয়া সোফিয়ার’!

রোমান ক্যাথলিক, অর্থডক্স খ্রিস্টান ও মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনাটি কেন সকলের কাছে এতো আকর্ষণীয় তার জবাব জানতে ভিতরে প্রবেশ করতে হবে! পিছন দিকের রয়েছে দুটি বিশাল প্রবেশ দ্বার, রয়েছে ৪০টি কারু কার্যময় জানালা। ডান পাশের দরজার ডানে ও বাম পাশের দরজার বামে প্রবেশ করতেই প্রথমেই চোখে পড়ে দুটি বিশাল সরাব মট। ১.৬ ও ১.৯ টন ধারণক্ষতাসম্পূর্ণ সরাব মট গুলো মারবেল পাথর দিয়ে তৈরি, যেগুলো তৈরি হয়েছিলো গ্রিস সভ্যতার যুগে। ধারণা করা হয় এগুলো প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো। ১৬৫ ফুট উচ্চতার চার্চটির ৫৩৭ সালে যখন নির্মাণ কাজ শেষ হয় তখন এটা ছিল ওই সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা।

মাথা ঘুরিয়ে চারপাশে তাকালে চোখে পড়বে অবাক হবার মতো শিল্প কর্ম। শত শত বছর ধরে সব যুগের বিখ্যাত শিল্পীদের তুলির আঁচড়ে অসম্ভব সুন্দর কারুকার্য স্থান পেয়েছে আয়া সোফিয়া জুড়ে। দেয়ালের শ্বেত পাথরের পরতে পরতে আছে যিশুখ্রিস্ট ও তার কুমারী মা মেরির হাজারও চিত্রকর্ম। বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের বিখ্যাত শাসক ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় যাজকদের ছবি রয়েছে দেয়ালের বিভিন্ন অংশে। অটোমান সাম্রাজ্যের বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ছবিও স্থান পেয়েছে আয়া সোফিয়া জুড়ে।

গত ১৫শত বছরের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত অনেক শিল্পীর তুলির আঁচড়ে অসম্ভব সুন্দর কারুকার্যে ভরপুর আয়া সোফিয়া। আর এই জন্যই পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনার মর্যাদায় অতিষ্ঠ আয়া সোফিয়া যুগে যুগে।

গত ১০ জুলাই ২০২০ তুর্কি রাষ্ট্রীয় আইনি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ৮৫ বছরের মিউজিয়ামকে আবার মসজিদে ফিরিয়ে আনেন এবং ২৪ জুলাই জুম্মার নামাজের মাধ্যমে এর নতুন মসজিদ যুগের সূচনা হয়। তবে এখনো আয়া সোফিয়ার দেয়াল জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবী ও যিশুখ্রিস্ট ও তার মা মেরির ছবি। ইসলামে যা হারাম। তাই নামাজের আযান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ আলোতে ঢাকা পড়ে যায় দেয়ালের সব ছবি। ফিরে আসে মসজিদ আদলের আয়া সোফিয়া।

আয়া সোফিয়া হলো হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শালা। যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছিল সম্রাজ্যের রাজধানী। আয়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে ফিরে পেয়ে খুশি অধিকাংশ তুর্কি নাগরিক। তবে অনেকে আবার মিউজিয়াম হিসেবে ও দেখতে চান এ বিরল ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনাটিকে। যদিও তাদের সংখ্যা অনেক কম। গীর্জা, মসজিদ কিংবা মিউজিয়াম-সব কিছুর ধারণ ক্ষমতা রয়েছে আয়া সোফিয়ার। যত বেশি বলা হয় না কেন তাও নগণ্য, যত বেশি দেখানো হয় না কেন তাও স্বল্প, কারণ আয়া সোফিয়ার বিশালতার মুগ্ধ পৃথিবী ও অবাক সব যুগের মানুষ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন