বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২০

সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ ?

 

https://assets.roar.media/Bangla/2017/12/Shrikant-feature.jpg

এক জীবনে কত কী করতে পারবেন আপনি? চারটি মাত্র মূল একাডেমিক ডিগ্রির পর নিয়োগ পরীক্ষা/বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকুরে হওয়ার পর বিয়ে করে স্থির হবেন? নাকি চারটার পর উচ্চতর একটি বা দুটি ডিগ্রি নিয়ে গবেষণায় মনোযোগী হয়ে স্থির হবেন? মোদ্দাকথা, গড়পড়তা মানুষ হলে ক্ষান্ত আপনি দেবেনই। কিন্তু কিছু মানুষ ভবলীলা সাঙ্গ না হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষান্ত দেন না। তেমনই একজন হলেন শ্রীকান্ত জিচকার।

প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের সংজ্ঞা কী, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সার্বজনীন কদরের ব্যাপারে কারো আপত্তি নেই। আর এদিক থেকেই অনন্য শ্রীকান্ত জিচকার। ভারত, মতান্তরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিশ্ববিদ্যালয়-ডিগ্রিধারী হলেন তিনি। ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০টি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ৪৯ বছরের জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে চিকিৎসক, আইনজীবী, পুলিশ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, চিত্রগ্রাহক, অভিনেতা, চিত্রকর সহ বহু কিছু; এবং সেই সাথে ভারতের সর্বকনিষ্ঠ এমএলএ। তাঁকে নিয়েই আজকের এ লেখা।

জন্ম

১৯৫৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশের নাগপুর জেলার কাটোলের আজামগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীকান্ত। তিনি সম্ভ্রান্ত কৃষক ‘কুম্বি’ পরিবারের সন্তান ছিলেন। স্ত্রী রাজশ্রী জিচকারের নাম ব্যতীত তাঁর পরিবারের অন্য কোনো সদস্য সম্পর্কে অন্তর্জালের উন্মুক্ত দুনিয়ায় তেমন তথ্য পাওয়া যায় না।

শিক্ষাজীবনে যত কীর্তি শ্রীকান্তের

শৈশব থেকেই দারুণ মেধাবী শ্রীকান্ত জিচকারের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো চিকিৎসক হবার। সে অনুযায়ীই এগিয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসক হলেনও, এমবিবিএস-এর পর এমডি ডিগ্রি নিয়ে পুরোদস্তুর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

এরপর কেন যেন তাঁর মনে হলো ডাক্তারিতে ঠিক পোষাচ্ছে না। ব্যস, আইনের ওপর ‘এলএলবি’ ডিগ্রি নিয়ে ফেললেন তিনি। আন্তর্জাতিক আইনের ওপর স্নাতকোত্তর ‘এলএলএম’ ডিগ্রি নিয়ে এবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থেকে বনে গেলেন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী।

সমাজের দুটো অভিজাত পেশায় ঢোকবার যোগ্যতা অর্জন করেও পেশাগত জীবনে প্রবেশ না করে তিনি একের পর এক ডিগ্রিই নিয়ে গেছেন। চিকিৎসাবিদ্যা, আইনের পর তিনি এলেন ব্যবসায় শিক্ষার দুনিয়ায়। ব্যবসা-ব্যবস্থাপনার ওপর ডিপ্লোমার সাথে এমবিএ করে ফেললেন এই অতিমানবীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি দারুণ ছবি তুলতে পারতেন এবং অসাধারণ বক্তা ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকতার পাঠের প্রতি বাড়তি ঔৎসুক্য ছিলো তাঁর। দেরি না করে সাংবাদিকতায় একটা ব্যাচেলর ডিগ্রিও নিয়ে ফেললেন শ্রীকান্ত।

এখানেই শেষ ভাবছেন? না, এ তো সবে শুরু। চিকিৎসাবিদ্যায় এমডি, আন্তর্জাতিক আইনে এলএলএম ও ব্যবসা-ব্যবস্থাপনায় এমবিএ ছাড়াই এই ব্যক্তির স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রিই আছে আরও ১০টি বিষয়ের ওপর।

  • লোকপ্রশাসন
  • সমাজবিজ্ঞান
  • অর্থনীতি
  • সংস্কৃত
  • ইতিহাস
  • ইংরেজি
  • দর্শন
  • রাষ্ট্রবিজ্ঞান
  • প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পুরাতত্ত্ব
  • মনোবিজ্ঞান

তিনি এসব বিষয়ে যে কোনোমতে মাস্টার্স পাস করেছেন, মোটেও তা নয়। প্রত্যেকটিতে প্রথম শ্রেণী তো পেয়েছেনই, সেই সাথে অধিকাংশ বিষয়েই পেয়েছেন প্রথম স্থান। শিক্ষাজীবনে তিনি স্বর্ণপদকই পেয়েছেন ২৮টি! এসবের সাথে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের ওপর নিয়েছেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি- ডক্টর অব লিটারেচার। ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা প্রতিটি গ্রীষ্ম ও শীতে তিনি ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কোনো না কোনো পরীক্ষায় বসেছেন। এতোটাই তাঁর একাগ্রতা!

পেশাজীবনেও সমান কীর্তিমান শ্রীকান্ত

চিকিৎসাবিদ্যা ও আইনের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে চিকিৎসক ও আইনজীবী হিসেবে অল্প কিছুদিন করে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর একে একে যখন যেটা করতে বা হতে মন চেয়েছে, তা-ই তিনি করেছেন, তা-ই তিনি হয়েছেন।

পুলিশ কর্মকর্তা

জীবনের ২৪টি বছর টানা পড়াশোনার পর তাঁর একসময় মতি হলো পুলিশের চাকরি করবার। যেই ভাবা সেই কাজ। বসে গেলেন ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস (আইপিএস) পরীক্ষায়। ফলাফল? কী আবার? যথারীতি সেখানেও উতরে গেলেন। সেটা ১৯৭৮ এর ঘটনা। দু’ বছর চুটিয়ে পুলিশের চাকরি করার পর তাঁর আবার ‘নতুনের নেশা’ চেপে বসলো।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা

১৯৮০-তে বসলেন ভারতের সবথেকে গৌরবময় সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা ‘ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস’-এ। এবার আর ‘বছর’ নয়, মোটে চারটা মাস গড়াতে সে চাকরিও ছেড়ে দিলেন তিনি। কিন্তু এবার স্বপ্ন আরও বড় কিছু হবার।

রাজনীতিক

সমাজসেবার মহান ব্রত সামনে নিয়ে এবার তিনি ঠিক করলেন রাজনীতিতে নামবেন। এমন গুণীকে কে না দলে পেতে চাইবে, আর কে-ইবা আটকে রাখবে! চাকরি ছাড়ার বছরই তিনি তাই কংগ্রেসের হয়ে মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে লড়বার টিকিট পান, বয়স তখন তাঁর মাত্র ২৫। মাত্র কয়েক মাসের নির্বাচনী প্রচারণায় নির্বাচনে জিতেও যান শ্রীকান্ত। তারুণ্যের প্রারম্ভেই তিনি বনে গেলেন ভারতের সর্বকনিষ্ঠ বিধায়ক বা এমএলএ।

শুধু কি বিধায়ক হয়েই থামলেন শ্রীকান্ত? ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে বিধায়ক থাকার পর ১৯৮৬-তে দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি হন মহারাষ্ট্রের প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য। প্রাথমিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলেও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, একই সময়ে তিনি সামলেছেন ১৪টা মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব! সুনিপুণ দক্ষতায় সেই দায়িত্বও সামলেছেন তিনি ১৯৯২ সাল অবধি। এরপর ১৯৯২ সালে নির্বাচনে জিতে ৪ বছর রাজ্যসভার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

১৯৮৬ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত বার্ষিক কেন্দ্রীয় সৈনিক সম্মেলনে মহারাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ড. শ্রীকান্ত জিচকারের হাতে রোলিং ট্রফি তুলে দিচ্ছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেস সভাপতি রাজীব গান্ধী; source:speakingtree.in

অন্যান্য

  • রাজনীতিক হিসেবে তো বটেই, ভারতের ইতিহাসেই সব থেকে বেশি ‘শিক্ষিত’ মানুষটি হওয়ার সুবাদে কূটনীতির বিশ্বমঞ্চেও ভারত আস্থা রেখেছিলো তাঁর উপর। ইউনেস্কো ও জাতিসংঘে ভারতের প্রতিনিধিত্বও করেছেন শ্রীকান্ত জিচকার।
  • পেশাদার হিসেবে তিনি তরুণ বয়স থেকে প্রৌঢ়ত্ব অবধি ছিলেন তুখোড় ফটোগ্রাফারও
  • প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ও পেশার বাইরে ছোটবেলা থেকে বড়বেলা অবধি যে কাজটি ভালোবেসে তিনি করেছেন, তা হলো ছবি আঁকা। চিত্রশিল্পী হিসেবেও বেশ নাম কামিয়েছিলেন এই গুণী।
  • মঞ্চ ছিলো তাঁর আগ্রহ ও ভালোবাসার অন্যতম জায়গা। অভিনেতা হিসেবে সেই মঞ্চেও সরব উপস্থিতি ছিলো তাঁর।
  • বাগ্মী হিসেবে তাঁর অপরিমেয় খ্যাতি ছিলো। পুরো বিশ্ব ঘুরে দেখেছেন ও গণবক্তা হিসেবে কথা বলেছেন জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শিল্প ও ধর্ম বিষয়ে।
  • জ্যোতিষশাস্ত্রের পাশাপাশি পৌরোহিত্যেও পারদর্শিতা ছিলো তাঁর। পৌরোহিত্যের কৃতিত্বের জন্য তিনি ভূষিত হন ‘দীক্ষিত’ উপাধিতে।

ধর্মীয়-সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন শ্রীকান্ত;source:indiatimes.com

সাফল্যের যত স্বীকৃতি

প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রীর সংখ্যাধিক্যের কারণে শ্রীকান্ত জিচকারকে চলতে-বলতে পারা ‘জীবন্ত-পুস্তক’ বলা যেতে পারে। এই ‘জীবন্ত পুস্তক’-এর ব্যক্তিগত সংগ্রহেই ছিলো ৫২,০০০ এর অধিক পুস্তক বা বই। পরবর্তীতে তাঁর নাগপুরস্থ সংগ্রহশালাকেই গণগ্রন্থাগার করা হয়, যার নামকরণ হয় তাঁর নিজ নামে।

ভারতের আরেক কৃতি এ.পি.জে. আবদুল কালামের সাথে শ্রীকান্ত; source: pinterest.com

১৯৮৩ সালে ‘বিশ্বের সেরা ১০ উদ্যমী তরুণ’-এর একজনের স্বীকৃতি লাভ করেন শ্রীকান্ত।

লিমকা বুক অব রেকর্ডস অনুযায়ী শ্রীকান্ত জিচকার হলেন ভারতের সবচেয়ে ‘শিক্ষিত’ ও ‘যোগ্যতাসম্পন্ন’ ব্যক্তি। অনেকের মতে, তাঁর এ কৃতিত্ব শুধু ভারতেই নয়, বরং বিশ্বমঞ্চেও অদ্বিতীয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সকল মানদণ্ড স্থানভেদে সমান না হওয়ায় এবং বিশ্বময় ঐ অর্থে কোনো জরিপ না হওয়ায় এটা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল যে, এই শ্রীকান্ত জিচকারই পৃথিবীর সবথেকে বেশি শিক্ষিত’ বা বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী কিনা।

মৃত্যু

অসামান্য প্রতিভাধর এই মানুষটির বর্ণময় জীবনের ইতি ঘটে ২০০৪ সালের ২ জুন। বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগামী ট্রাক শ্রীকান্তের ব্যক্তিগত গাড়িকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলে মৃত্যু ঘটে তাঁর। দুর্ঘটনার জন্য শ্রীকান্ত জিচকারের পরিবারকে ৫০.৬৭ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। কিন্তু ভারত তথা বিশ্ব যে তার এক রত্নকে হারালো, তাকে কি কোনো মূল্যমানে নির্ধারিত করা যায়?

দুর্ঘটনা কবলিত সেই গাড়ি;source:speakingtree.in

মাত্র ৪৯টি বছর পৃথিবীতে বিরাজ করে এত এত কীর্তি গড়ে চিরবিদায় নেবার সৌভাগ্য ক’জনের হয়! একাগ্রতা, সংকল্পের দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস দিয়ে যেকোনো অসাধ্য সাধন করার অনুপ্রেরণা তো তাঁর কাছ থেকে নেওয়া যেতেই পারে।

ফিচার ইমেজ: linkedin.com


Shared by Pranab Kumar Kundu


 

 

 

 

 

Pranab Kumar Kundu

বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

আহত রিক্সাচালক

 আহত রিক্সাচালক

 

শেয়ার করেছেন :- প্রণব কুমার কুণ্ডু



 
 
 
 
 
 
 
 
প্রণব কুমার কুণ্ডু
 
 
 
 
 
 
 
 

স্বামীবাগ / ইসকন / ঢাকা

 স্বামীবাগ / ইসকন / ঢাকা

 

 

শেয়ার করেছেন :- প্রণব কুমার কুণ্ডু















প্রণব কুমার কুণ্ডু

পানামা খাল

 

পানামা খাল

পানামা খাল: বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল জলপথ

এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

সময়টা ১৯০৩, নির্মাণাধীন পানামা খালে বৃষ্টিস্নাত একদিন। যে দেশে বছরে ৮০ শতাংশ সময় বৃষ্টি হয়, সেখানে এমন ভেজা পাথুরে পাহাড়ে কাজ করতে গিয়ে একজন শ্রমিক হঠাৎ পা পিছলে মৃত্যুদুয়ারে হাজির হবে, তা কি হর্তাকর্তাদের অজানা? ঠিক তখন থেকে শুরু করে ১৯১৪ পর্যন্ত দুর্ঘটনা, ম্যালেরিয়া, পীত্ জ্বরে মারা যায় আরো ৫,৬০০ জন। সরকারি খাতায় থাকা এই ৫,৬০০ জনের অংকটা বাস্তবে হয়তো আরো বড় (ধারণা অনুসারে ২২,০০০ জন)। ৮০ মিটার লম্বা প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই কৃত্রিম জলপথটি বাস্তবেই যেন এক বিস্ময়! কিন্তু উনিশ শতকের এই স্থাপনা কী করে একুশ শতকের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে? তার একটা ছোট্ট বিবরণ চলুন জেনে নিই।

নির্মাণ শ্রমিকদের কয়েকজন । Image source: rarehistoricalphotos.com

নির্মাণশ্রমিকদের কয়েকজন; Image source: rarehistoricalphotos.com

১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল প্রকল্পে ফরাসিদের সাফল্যের পর আমেরিকা উত্তর আমেরিকার সাথে ইউরোপ, এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকার দূরত্ব কমাতে বিকল্প একটি জলপথ তৈরির চিন্তা করতে থাকে। পানামা খাল তৈরির আগে ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে অথবা এশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকার দক্ষিণে পৌঁছাতে পুরো দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল সংলগ্ন এলাকা পাড়ি দিতে হতো। যাতে গন্তব্যে পৌঁছাতে লেগে যেত অতিরিক্ত ১৪ দিন এবং পাড়ি দিতে হতো আরও প্রায় সাড়ে বারো হাজার কিলোমিটার জলপথ।

পানামা (তৎকালীন কলাম্বিয়ার অংশ) ও এর পার্শ্ববর্তী দেশ নিকারাগুয়া; দুটি দেশই প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচলকারী জাহাজের এই অতিরিক্ত দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারত। কিন্তু নিকারাগুয়ায় অসংখ্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরির প্রভাব এবং পানামায় সেসময় চলাকালীন ফরাসিদের খাল খননের ব্যর্থ প্রচেষ্টা আমেরিকার প্রকৌশলীদের পানামাতেই কাজটি সম্পন্ন করার পেছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

১৯০৩ সালে তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ফরাসিদের থেকে নির্মাণাধীন খাল খনন প্রকল্পটি কিনে নেন। এরই মাধ্যমে শুরু হয় এক যুগেরও বেশি সময়ব্যাপী পানামা খালের খনন কাজ। কিন্তু ১৯০৩ সালে পানামা ছিল কলাম্বিয়ার একটি অংশ। পানামা খাল প্রকল্পের শুরুতে আমেরিকা কলাম্বিয়ার সাথে Hay- Herran চুক্তি স্বাক্ষর করতে চান, যার মাধ্যমে পানামা খাল ও সংলগ্ন এলাকায় আমেরিকার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেসময় পানামাও কলাম্বিয়া থেকে স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টায় ছিল। তখনই আমেরিকার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পানামা রক্তপাতহীনভাবে কলাম্বিয়ার থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং বিনিময়ে আমেরিকানদের পানামা খালে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে Torrjios- Carter চুক্তি স্বাক্ষরের  মাধ্যমে ১৯৯৯ সালে আমেরিকা খালটির দায়িত্ব পানামাকে ফিরিয়ে দেয়। 

পানামা খাল না থাকলে এতটা পথ ঘুরে যেতে হতো; Image source: AJOT.com

আঠারো শতকে লোহিত সাগরের সৈয়দ বন্দর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগকারী সুয়েজ খাল তৈরি করেছিল যে ফরাসিরা, তারাই কিন্তু পানামা খাল তৈরির প্রকল্প আমেরিকানদের আগে শুরু করে। কিন্তু পানামার বন্ধুর ভূমি ও সমতল মিশর ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যে একে অপরের থেকে পুরোপুরি আলাদা। এ কারণেই সুয়েজ খালের আদলে পানামা খালের নকশা করাটাই ছিল ফরাসি প্রকৌশলীদের একটি বড় ভুল। 

ফরাসিদের থেকে দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই আমেরিকানরা বুঝতে পারে, পানামার এই পাহাড়ি প্রকৃতিতে খাল তৈরির প্রক্রিয়াটি হবে খুব জটিল ও চ্যালেঞ্জিং। তাই সেসময় বিশ্বজুড়ে উদীয়মান আমেরিকান আধিপত্যের কাছে বন্ধুর এই প্রকৃতিতে সফলভাবে জলপথটি তৈরি করা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবের। ধারণা করা হয়, পানামা খাল তৈরির জন্য আমেরিকান প্রশাসন শুরুতে যে বাজেট করেছিল তার চেয়ে প্রায় ৪৪৪ শতাংশ বেশি অর্থ বরাদ্দ করতে হয় কাজটি সফলভাবে শেষ করতে। 

এবার কথা বলা হবে পানামা খাল নির্মাণের প্রধান অন্তরায়গুলো নিয়ে। লেখাটির শুরুতেই বলা হয়েছে নির্মাণশ্রমিকদের মৃত্যুঝুঁকির কথা। এছাড়াও পানামার বৃষ্টিস্নাত ও আর্দ্র জলবায়ু, ভূমিধ্বস ব্যয়বহুল নির্মাণশৈলী শুরু থেকেই ফরাসি প্রকৌশলীদের নিরুৎসাহিত করছিল।

১৯১৩ সালে মাটি ধ্বসের পর শ্রমিকরা কাজে নেমেছেন।

১৯১৩ সালে মাটি ধসের পর শ্রমিকরা কাজে নেমেছেন; Image source: realhistoricalphotos.com  

পানামা খালটির ভৌগলিক নকশা অনুযায়ী পার্বত্য অঞ্চলে এর অবস্থান হওয়ার কথা। ফলে পাহাড় কেটে যদি খালটি তৈরি করা হত তবে খালের পানির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতার সমান হওয়া জরুরি ছিল। কারণ উঁচু জায়গা থেকে পানি সবসময়ই নিচু জায়গার দিকে প্রবাহিত হয়। তাই খালের অবস্থান উঁচুতে হলে তাতে পানিও থাকবে না আর জাহাজও চলতে পারবে না। সে কারণেই ফরাসিরা পাহাড়গুলো একবারে কেটে সমতল ভূমি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এ ধরনের নকশায় পারিপার্শ্বিক ভূপ্রকৃতি ও বৃষ্টি প্রধান এলাকা হওয়ায় খালটি সমুদ্রের সাথে এক সমতলে যদি তৈরি হতো তবে পাহাড় থেকে আশেপাশের মাটি ধ্বসে খালটি ভরাট হয়ে যেত। সেক্ষেত্রে পুনরায় খালটি আবার খনন করতে হতো। নির্মাণকাজ শুরুর অল্প কয়েক বছর পরে নকশার এত বড় ত্রুটি দেখেই তারা মূলত প্রকল্পটি আমেরিকানদের কাছে বিক্রি করে দেয়। 

কিন্তু আমেরিকা পাহাড় কেটে সমতল ভূমির তৈরির পরিবর্তে জাহাজকে কীভাবে পাহাড়ে তোলা যায় তার ব্যবস্থা করে, যার জন্য নির্মাণ করতে হয় আরো একটি বড় প্রকল্প- গাতুন হ্রদ, যা এক সময় ছিল পৃথিবীর বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ। অতএব আমেরিকার নকশা অনুযায়ী, পানামা খালে জাহাজগুলো প্রবেশ করে প্রথমেই কতগুলো কৃত্রিমভাবে বদ্ধ জলাশয়ে, যেগুলোকে বলা হয় 'লক'। এর মাধ্যমে জাহাজগুলোকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৬ মিটার উঁচুতে গাতুন হ্রদ পর্যন্ত তোলা হবে এবং এই হ্রদ পাড়ি দিয়ে পুনরায় কিছু লক অতিক্রম করে জাহাজগুলো সাগরে নেমে যাবে।

১৯১৩ সালে নির্মাণাধীন লকগুলো; Image source: realhistoricalphotos.com

আটলান্টিক থেকে কোনো জাহাজ পানামা খালের দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করতে চাইলে প্রথমে তাকে তিনটি লক পাড়ি দিতে হবে। এই লকগুলোর দুপাশে দুটি দরজা থাকে এবং মেঝেতে পাশের উঁচু লক থেকে নিচু লকটির দিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি প্রবাহিত করার ব্যবস্থা থাকে। একটি জাহাজ প্রথম লকের সমুদ্রের দিকে এসে পৌঁছালে দ্বিতীয় লক থেকে পানি প্রথম লকে ভরা হয়, যাতে প্রথম লকের পানি এবং সমুদ্রের পানির উচ্চতা সমান হয়। তখন সমুদ্রের দিকের দরজাটি খুলে দিলে জাহাজ প্রথম লকে ঢুকে যায় এবার দ্বিতীয় লকটি থেকে আরো পানি প্রথম লকে ঢোকানো হয়, যাতে প্রথম ও দ্বিতীয় লকের পানি সমান উচ্চতায় থাকে এবং জাহাজ দ্বিতীয় লকের উচ্চতা পর্যন্ত ভেসে ওঠে। তখন দ্বিতীয় লকের দরজাটি খুলে দিলে জাহাজ এতে ঢুকে যায়। এভাবেই জাহাজটি পৌঁছে যায় ২৬ মিটার উচ্চতার গাতুন হ্রদে। তৈরির সময় প্রতিটি লকের দুটো দরজার মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় ৩২০ মিটার এবং প্রস্থে লকগুলো প্রায় ৩৩.৫৩ মিটার। লকগুলো প্রায় ২৬.৭ মিলিয়ন গ্যালন পানি ধারণ করতে পারে এবং পানিপূর্ণ করতে সময় লাগে প্রায় ৮ থেকে ১০ মিনিট। 

জাহাজগুলো পানিতে ভাসিয়ে ওপরে তোলা হয়; Image source: Gfycat

আগেই বলা হয়েছে, গাতুন হ্রদের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৬ মিটার। শাগ্রে নদী (Chagres river) হলো পানামা খালের পানির অন্যতম উৎস। এই নদীতে দুটো বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে হ্রদটি। জাহাজগুলোকে এখানে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে পেদ্রো মিগেল লকে পৌঁছাতে। এই হ্রদটি তৈরির সময় ৭.২ বিলিয়ন কিউবিক ফুট পাথর ও মাটি খুঁড়ে তোলা হয়, যা ছিল সুয়েজের প্রায় তিনগুণ। এগুলো পরে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় ফেলা হয়, যেখানে বর্তমানে গড়ে উঠেছে সেনা ক্যাম্প। 

এই বাঁধগুলো গাতুন হ্রদের পানিকে আটকে রাখে; Image source: realhistoricalphotos.com

আটলান্টিক থেকে পানামা খাল দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করতে একটি জাহাজের সময় লাগে প্রায় ৮-১০ ঘণ্টা। এত দীর্ঘ ও যান্ত্রিক একটি জলপথ পাড়ি দিতে জাহাজগুলোকে কিন্তু উচ্চহারে শুল্ক দিতে হয়। বলা হয়ে থাকে, পানামা খালের এই শুল্কহার পৃথিবীর অন্যান্য সব জলপথের শুল্কের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। এ কারণেই একে বলা হয় সবচেয়ে ব্যয়বহুল জলপথ। প্রায় ৮০ মিটার দীর্ঘ এই জলপথ দিয়ে বছরে প্রায় ১৪ হাজারেরও বেশি জাহাজ চলাচল করে।       

১৯১৪ সালে S.S.Anchon জাহাজের যাত্রার মধ্যে দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে পানামা খাল; Image source: realhistoricalphotos.com

কিন্তু উনিশ শতকের এই খালটিকে একুশ শতকেও ব্যবহার উপযোগী ও প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে বেশ কিছু পরিবর্তন করতে হয়েছে। পানামা খালের এই লক সিস্টেম থাকার কারণে লকগুলোর মাপের চেয়ে জাহাজ বড় হলে তা পানামা খাল দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। অপরদিকে, পানামার উচ্চ শুল্ক পরিশোধ সত্ত্বেও জাহাজগুলোর ধারণ ক্ষমতা তেমন বেশি না হলে জাহাজ মালিকদের লোকসান হবে। এ কারণেই ২০১৬ সালে এই লকগুলো পরিবর্তন করে এগুলো আরও বড় করা হয়।

এখন ২০২০ সালে পানামা দিয়ে কোনো জাহাজ ঢুকতে চাইলে এগুলো সর্বোচ্চ ৩৬৬ মিটার লম্বা এবং ৫১ মিটার প্রস্থের হতে পারবে। এছাড়াও পানামার আরও একটি প্রধান সমস্যা হলো, এখানে জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত পানি দিয়ে ভাসিয়ে উঁচুতে তোলা হয়। ফলে জাহাজগুলোর ওজন যদি অনেক বেশি হয়ে যায় তবে লকগুলোর ধারণক্ষমতা অনুযায়ী পানি দিলেও জাহাজগুলো কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা পর্যন্ত ভেসে উঠবে না। এ কারণেই ২০১৬ সালে লকগুলোর গভীরতাও কিছুটা বাড়ানো হয়। 

আগে যেখানে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওজন ছিল সর্বোচ্চ ৫,০০০ TEU, বর্তমানে সর্বোচ্চ ওজন সেখানে করা হয়েছে ১৫,০০০ TEU। আর পানামা খালের এই আকৃতি বর্ধনের ফলে বর্তমানে জাহাজগুলোও বড় আকারে তৈরি করা হচ্ছে, যেগুলোকে বলা হয় নিও পানামাক্স (Neo Panamax) জাহাজ।

নিও পানামাক্স (Neo Panamax) জাহাজ; Image source: FreightWaves.com

তবে পানামা খাল বর্ধিতকরণের রয়েছে বাটারফ্লাই ইফেক্ট। কারণ, খালের ধারণক্ষমতা বেশি হওয়ায় বড় মাপের জাহাজ এখান দিয়ে চলাচল করবে। এ কারণেই বড় জাহাজগুলো যে দেশের বন্দরে গিয়ে ভিড়বে তাদের বন্দরের ধারণক্ষমতাও হতে হবে জাহাজগুলোর উপযোগী। এজন্য জলপথটি ব্যবহারকারী দেশগুলোকে তৈরি করতে হয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর এবং নদীপথগুলোকেও করতে হয়েছে আরো গভীর।

২০০৭-১৫ পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সংস্কার করা হয়েছে খালটির; Image source: The Seattle Times

এতকিছু সত্ত্বেও শতাব্দী প্রাচীন এই খালটির উচ্চ শুল্কহার এবং জাহাজের আকৃতির ও ওজনের বিধি-নিষেধ নিকারাগুয়াকে রাজনৈতিকভাবে উৎসাহিত করে তুলছে বিকল্প একটি জলপথ তৈরির কাজে। বেশ কয়েক বছর আগে চীনের কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকেও বিষয়টি নিয়ে ঘাটতে দেখা গেছে। কিন্তু বিকল্প জলপথের জন্য চাই প্রচুর অর্থ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং প্রকৌশলীদের সঠিক নির্মাণশৈলী। তবে যতদিন এসব কিছুর একসাথে সমন্বয় না হচ্ছে ততদিন এ পানামা খাল হয়ে থাকবে এশিয়া-ইউরোপের সাথে উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার সেতুবন্ধন। 

This article is about the Panama Canal. This Canal is an artificial 82 km waterway in Panama that connects the Atlantic Ocean with the Pacific Ocean. Necessary information has been hyperlinked in the article.

Feature Image: Cruises News Media Group


Shared by Pranab Kumar Kundu


 






Pranab Kumar Kundu

তথাগত রায়

 

জিন্নার একমাত্র জীবিত বংশধর ভারতের ধনকুবের শিল্পপতি

 

জিন্নার একমাত্র জীবিত বংশধর ভারতের ধনকুবের শিল্পপতি


 

জিন্নার একমাত্র জীবিত বংশধর
ভারতের ধনকুবের শিল্পপতি

নয়াদিল্লি: জন্ম পাকিস্তানে অথচ বেড়ে উঠেছেন ভারতে, এমন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বদের তালিকা বেশ লম্বা। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। প্রখ্যাত গীতিকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক গুলজার। ঋষি কাপুরদের পৈতৃক ভিটেও পাকিস্তানের পেশোয়ারে। বলে শেষ করা যাবে না। দেশভাগের সময় অনেকেই পরিবার পরিজনদের নিয়ে এদেশে এসেছেন। তারপর নিজেদের ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছেন। এই তথ্যে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু খোদ পাকিস্তানের জন্মদাতা যিনি, সেই ‘কয়েদ-ই-আজম’ মহম্মদ আলি জিন্নার নাতি কি না আগাগোড়া ভারতীয় নাগরিক — এই খবরে সামান্য হলেও কৌতূহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আর সেই কৌতূহলের পারদ আরও কিছুটা চড়তে পারে অন্য একটি তথ্যে। সেটি হল, জিন্নার সরাসরি বংশধরদের মধ্যে তিনিই একমাত্র জীবিত। তিনি ছাড়া ভারত কিংবা পাকিস্তানে জিন্না’র আর কোনও উত্তরসূরী নেই। সেই ভদ্রলোক অবশ্য মোটেও খবরের আড়ালে থাকা ছাপোষা ব্যক্তি নন। বরং, ভারতীয় শিল্পমহলে তাঁর নাম আজও সম্ভ্রমের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তিনি নুসলি ওয়াদিয়া। ভারতের প্রথমসারির শিল্পপতিদের একজন। ধনকুবের। বাণিজ্যের দুনিয়ায় তাঁর উত্থানের কাহিনী যেমন চমকপ্রদ। তেমনই বিস্ময়কর হচ্ছে নুসলির ব্যক্তি জীবনের অতীত ইতিহাসও।
ঐতিহাসিকদের একটা বড় অংশ মনে করেন, ভারত ভাগের সলতে পাকানোয় প্রত্যক্ষ মদত ছিল জিন্নার। সেই কাজে তিনি সফলও হয়েছিলেন। অর্জন করেছিলেন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেলের পদ। কিন্তু ভাগ্যের এমনই পরিহাস যে, অনুগামীদের পাশে পেলেও নিজের মেয়েকেই দেশে ফেরাতে ব্যর্থ হন তিনি। এর নেপথ্যের কাহিনি পরে খোলসা করেন জিন্নার সেই সময়ের সহকারী মহম্মদ আলি করিম। তিনি এক জায়গায় জানিয়েছেন, জিন্নার মেয়ে দিনা ছিলেন হুবহু তাঁর বাবার ছাঁচে গড়া। ডাকাবুকো আর ঠোঁটকাটা। উনিশ বছর বয়সেই দিনা মুম্বইয়ের শিল্পপতি নেভিল ওয়াদিয়ার প্রেমে পড়েন। তারপর অনেক ভেবেচিন্তে দু’জনে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বাবাকে না জানিয়ে কিছুতেই এক পা এগতে চাননি দিনা। একদিন সাহস করেই জিন্নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সবকিছু খুলে বলেন তিনি। ফল যা হওয়ার তাই হয়। স্বাভাবিকভাবেই বেঁকে বসেন জিন্না। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এ বিয়ে কোনওমতেই হতে পারে না। একজন পার্সি ছেলের হাতে মেয়েকে কিছুতেই তুলে দিতে পারেন না তিনি। দেশে তো অনেক মুসলিম ছেলে রয়েছে। তাঁদের কাউকেই কি দিনার পছন্দ নয়? সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন জিন্না। কিন্তু ক্রুদ্ধ জিন্নাহ চোখে চোখ রেখে ধীর গলায় দিনা এর জবাবে যা বলেছিলেন, তা কোনও মুসলিম পরিবারের মেয়ের পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল কি না সন্দেহ। করিমের কথা ধার করে বললে দিনার জবাব ছিল এরকম— ‘বাবা, তাহলে আপনি ভারতে হাজারো মুসলিম মেয়ে থাকা সত্ত্বেও বেছে বেছে কেন একজন পার্সি রমণীকেই ঘরে আনলেন?’ দিনার মা রতনবাঈ পেটিট ছিলেন পার্সি। বিয়ের পর তিনি মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন। নাম পাল্টে রাখেন মারিয়ম।
যাইহোক, দিনার স্পষ্ট জবাবের ফল ভালো হয়নি। বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। মুম্বইয়ে ফিরে নেভিলের সঙ্গে নতুন করে সংসার পাতেন। এর পরই দম্পতির কোল আলো করে জন্ম নেন নুসলি। বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় আর কোনওদিন পাকিস্তানে যাননি দিনা। যাবতীয় পারিবারিক সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত হয়েছিলেন তিনি। স্বাধীন ভারতীয় নাগরিকের পরিচয়েই বাকি জীবন কাটিয়েছেন। ছেলেকেও সেই আদর্শে বড় করে তুলেছেন দিনা। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে মৃত্যু হয় তাঁর। মা’য়ের একগুঁয়ে স্বভাব অর্জন করেছেন নুসলি। টাটা-বিড়লা, আম্বানি-আদানিদের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় তিনিও সমানে টক্কর দিয়ে চলেছেন। হাজার হোক, দোর্দন্ড ‘কয়েদ-ই-আজম’-এর রক্ত বইছে তাঁর শরীরে। যুদ্ধের আগে পরাজয় স্বীকারের অর্থ নুসলির অজানা!
 নুসলি ওয়াদিয়া
 
বর্তমান


শেয়ার করেছেন :- প্রণব কুমার কুণ্ডু







প্রণব কুমার কুণ্ডু

জিন্নার মেয়ের তরফে বংশধর ভারতের শিল্পপতি নুসলি ওয়াদিয়া

 


 

জিন্নার মেয়ের তরফে বংশধর ভারতের শিল্পপতি নুসলি ওয়াদিয়া

 

 
 
নয়াদিল্লি: জন্ম পাকিস্তানে অথচ বেড়ে উঠেছেন ভারতে, এমন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বদের তালিকা বেশ লম্বা। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। প্রখ্যাত গীতিকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক গুলজার। ঋষি কাপুরদের পৈতৃক ভিটেও পাকিস্তানের পেশোয়ারে। বলে শেষ করা যাবে না। দেশভাগের সময় অনেকেই পরিবার পরিজনদের নিয়ে এদেশে এসেছেন। তারপর নিজেদের ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছেন। এই তথ্যে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু খোদ পাকিস্তানের জন্মদাতা যিনি, সেই ‘কয়েদ-ই-আজম’ মহম্মদ আলি জিন্নার নাতি কি না আগাগোড়া ভারতীয় নাগরিক — এই খবরে সামান্য হলেও কৌতূহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আর সেই কৌতূহলের পারদ আরও কিছুটা চড়তে পারে অন্য একটি তথ্যে। সেটি হল, জিন্নার সরাসরি বংশধরদের মধ্যে তিনিই একমাত্র জীবিত। তিনি ছাড়া ভারত কিংবা পাকিস্তানে জিন্না’র আর কোনও উত্তরসূরী নেই। সেই ভদ্রলোক অবশ্য মোটেও খবরের আড়ালে থাকা ছাপোষা ব্যক্তি নন। বরং, ভারতীয় শিল্পমহলে তাঁর নাম আজও সম্ভ্রমের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তিনি নুসলি ওয়াদিয়া। ভারতের প্রথমসারির শিল্পপতিদের একজন। ধনকুবের। বাণিজ্যের দুনিয়ায় তাঁর উত্থানের কাহিনী যেমন চমকপ্রদ। তেমনই বিস্ময়কর হচ্ছে নুসলির ব্যক্তি জীবনের অতীত ইতিহাসও।
ঐতিহাসিকদের একটা বড় অংশ মনে করেন, ভারত ভাগের সলতে পাকানোয় প্রত্যক্ষ মদত ছিল জিন্নার। সেই কাজে তিনি সফলও হয়েছিলেন। অর্জন করেছিলেন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেলের পদ। কিন্তু ভাগ্যের এমনই পরিহাস যে, অনুগামীদের পাশে পেলেও নিজের মেয়েকেই দেশে ফেরাতে ব্যর্থ হন তিনি। এর নেপথ্যের কাহিনি পরে খোলসা করেন জিন্নার সেই সময়ের সহকারী মহম্মদ আলি করিম। তিনি এক জায়গায় জানিয়েছেন, জিন্নার মেয়ে দিনা ছিলেন হুবহু তাঁর বাবার ছাঁচে গড়া। ডাকাবুকো আর ঠোঁটকাটা। উনিশ বছর বয়সেই দিনা মুম্বইয়ের শিল্পপতি নেভিল ওয়াদিয়ার প্রেমে পড়েন। তারপর অনেক ভেবেচিন্তে দু’জনে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বাবাকে না জানিয়ে কিছুতেই এক পা এগতে চাননি দিনা। একদিন সাহস করেই জিন্নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সবকিছু খুলে বলেন তিনি। ফল যা হওয়ার তাই হয়। স্বাভাবিকভাবেই বেঁকে বসেন জিন্না। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এ বিয়ে কোনওমতেই হতে পারে না। একজন পার্সি ছেলের হাতে মেয়েকে কিছুতেই তুলে দিতে পারেন না তিনি। দেশে তো অনেক মুসলিম ছেলে রয়েছে। তাঁদের কাউকেই কি দিনার পছন্দ নয়? সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন জিন্না। কিন্তু ক্রুদ্ধ জিন্নাহ চোখে চোখ রেখে ধীর গলায় দিনা এর জবাবে যা বলেছিলেন, তা কোনও মুসলিম পরিবারের মেয়ের পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল কি না সন্দেহ। করিমের কথা ধার করে বললে দিনার জবাব ছিল এরকম— ‘বাবা, তাহলে আপনি ভারতে হাজারো মুসলিম মেয়ে থাকা সত্ত্বেও বেছে বেছে কেন একজন পার্সি রমণীকেই ঘরে আনলেন?’ দিনার মা রতনবাঈ পেটিট ছিলেন পার্সি। বিয়ের পর তিনি মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন। নাম পাল্টে রাখেন মারিয়ম।
যাইহোক, দিনার স্পষ্ট জবাবের ফল ভালো হয়নি। বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। মুম্বইয়ে ফিরে নেভিলের সঙ্গে নতুন করে সংসার পাতেন। এর পরই দম্পতির কোল আলো করে জন্ম নেন নুসলি। বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় আর কোনওদিন পাকিস্তানে যাননি দিনা। যাবতীয় পারিবারিক সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত হয়েছিলেন তিনি। স্বাধীন ভারতীয় নাগরিকের পরিচয়েই বাকি জীবন কাটিয়েছেন। ছেলেকেও সেই আদর্শে বড় করে তুলেছেন দিনা। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে মৃত্যু হয় তাঁর। মা’য়ের একগুঁয়ে স্বভাব অর্জন করেছেন নুসলি। টাটা-বিড়লা, আম্বানি-আদানিদের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় তিনিও সমানে টক্কর দিয়ে চলেছেন। হাজার হোক, দোর্দন্ড ‘কয়েদ-ই-আজম’-এর রক্ত বইছে তাঁর শরীরে। যুদ্ধের আগে পরাজয় স্বীকারের অর্থ নুসলির অজানা!
 নুসলি ওয়াদিয়া

 বর্তমান থেকে শেয়ার করেছেন :- প্রণব কুমার কুণ্ডু








প্রণব কুমার কুণ্ডু